নাদিয়ার ঘুম ভাঙল ভোর পাঁচটায়। জানালার ফাঁক দিয়ে আলো ঢুকছিল। পাশের ঘরে নাদিম এখনো ঘুমাচ্ছে। শ্বাস-প্রশ্বাসের আওয়াজ ভেসে আসছিল।
নাদিয়া উঠে বসল। গতকাল রাতের কথা মনে পড়ল। কবির মেসেজ দিয়েছিল—
“আপা, রহিম আজ দুপুরের মধ্যে আপনার বাড়িতে পৌঁছাবে। সে ফটোগ্রাফার। বিশ্বাসযোগ্য মানুষ। আপনি শুধু প্রস্তুত থাকুন। শাড়ি কয়েকটা রাখবেন, আর যদি সম্ভব হয় একটা-দুইটা আধুনিক পোশাক। শুট বাইরে বা ভিতরে—আপনার সুবিধামতো।”
নাদিয়া সেই মেসেজ বারবার পড়েছিল। নাদিমকে বলেছিল ট্রায়ালের কথা, ছেলে উৎসাহ দিয়েছিল। তবু মনের ভিতর একটা অস্থিরতা কাজ করছিল।
সকালে নাদিম ঘুম থেকে উঠে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “মা, আজ যে রহিম আসবে তো? আমি কলেজ স্কিপ করি? তোমার সাথে থাকি?”
নাদিয়া দ্রুত মাথা নাড়ল। “না নাদিম। তুই কলেজ যা। আমি সামলে নিতে পারব। তুই গেলেই ভালো। আর কী দরকার?”
নাদিম একটু দ্বিধা করে বলল, “ঠিক আছে। কিন্তু কোনো সমস্যা হলে ফোন দিস। আমি ছুটে আসব।”
নাদিয়া ছেলের মাথায় চুমু খেয়ে বলল, “যা কলেজে। পড়াশোনা কর।”
নাদিম বেরিয়ে গেল। বাড়িটা চুপচাপ হয়ে গেল। নাদিয়া রান্নাঘরে গিয়ে চা বানাল। একা চা খেতে খেতে কবিরের মেসেজগুলো আবার পড়ল। কবির গত রাতে লিখেছিল, “আপা, আপনি নার্ভাস হবেন না। রহিম ভদ্র মানুষ। শুধু ছবি তুলবে। আপনি যেমন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন তেমনই করবেন।”
নাদিয়া নিজেকে প্রস্তুত করতে লাগল। আলমারি খুলে শাড়ি বেছে নিল। প্রথমে একটা সাদা সুতি শাড়ি, তারপর একটা মারুন রঙের, তারপর একটা কালো জরির শাড়ি। আধুনিক পোশাক বলতে তার কাছে তেমন কিছু ছিল না। একটা কালো পাঞ্জাবি আর একটা জিন্স—নাদিমের কেনা, যেটা সে কখনো পরেনি। সেগুলোও একপাশে রাখল।
দুপুর ঘনিয়ে এলে দরজায় কর্কশ আওয়াজ হলো। নাদিয়া দরজা খুলে দেখল একজন লম্বা, গাঢ় রঙের পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে। হাতে ক্যামেরা ব্যাগ, কাঁধে আরেকটা ব্যাগ। বয়স আনুমানিক ৩২-৩৩।
“আসসালামু আলাইকুম। আমি রহিম। কবির ভাই পাঠিয়েছেন,” সে বলল।
নাদিয়া সামনে সরে দাঁড়াল। “ওয়ালাইকুম আসসালাম। আসুন।”
রহিম ভিতরে ঢুকল। চোখ ঘুরিয়ে বাড়িটাকে দেখল। “বাড়িটা সুন্দর সাজিয়েছেন। গ্রামে এমনটা কম দেখা যায়।”
নাদিয়া চা আনতে গেল। রহিম বসার ঘরে বসল। ক্যামেরা ব্যাগ খুলে লেন্সগুলো সাজাতে লাগল। নাদিয়া চা দিয়ে এসে বলল, “একটু চা খান।”
রহিম চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলল, “আপা, আজকের শুটটা সিম্পল হবে। প্রথমে শাড়িতে কয়েকটা শট। তারপর যদি আপনি রাজি থাকেন, একটু অন্য পোশাকে। আলো ভালো পাওয়া যায় উঠোনে। চলবে?”
নাদিয়া মাথা নাড়ল। “চলবে।”
প্রথমে উঠোনে গেল তারা। রহিম ত্রিপড লাগাল। নাদিয়া সাদা শাড়ি পরে বেরোল। চুল আধখোলা। রহিম ক্যামেরা চোখে লাগিয়ে বলল, “আপা, একটু সামনে আসুন। হ্যাঁ… এবার ডানদিকে ঘুরে দাঁড়ান। শাড়ির আঁচলটা একটু হাতে নিয়ে হাঁটুন।”
নাদিয়া হাঁটল। রহিমের কণ্ঠস্বর শান্ত, কিন্তু নির্দেশগুলো স্পষ্ট। “একটু ধীরে… চোখ ক্যামেরার দিকে… হাসুন একটু… হ্যাঁ, এমনই।”
কয়েকটা শট তোলার পর রহিম বলল, “আপা, এবার মারুন শাড়িটা পরুন। ওটা আপনার গায়ে ভালো লাগবে।”
নাদিয়া ভিতরে গিয়ে শাড়ি বদলাল। মারুন শাড়ি পরতে গিয়ে দেখল ব্লাউজটা একটু টাইট। গলার নিচটা খোলা। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটু টানল। তারপর বেরিয়ে এল।
রহিমের চোখ একমুহূর্তের জন্য থেমে গেল। সে দ্রুত ক্যামেরা তুলল। “দারুণ লাগছে। এবার একটু পেছন ফিরে দাঁড়ান… শাড়ির ভাঁজটা দেখানোর জন্য… হ্যাঁ… এবার সামনে তাকান।”
শুট চলতে লাগল। রহিম মাঝে মাঝে এসে শাড়ির আঁচল সরিয়ে দিত, চুল এলোমেলো করে দিত। তার আঙুল নাদিয়ার কাঁধে বা ঘাড়ে লাগত। নাদিয়া প্রতিবারই একটু কেঁপে উঠত, কিন্তু কিছু বলত না।
একসময় রহিম বলল, “আপা, একটু বসুন ওই পিঁড়েটার উপর। শাড়িটা একটু ভাঁজ করে উরু পর্যন্ত তুলুন। আলো পড়বে ভালো।”
নাদিয়া ইতস্তত করল। “উরু পর্যন্ত?”
রহিম হাসল। “আপা, এটা শুধু শটের জন্য। ক্যামেরায় খুব সুন্দর লাগবে। আপনি চাইলে পরে ডিলিট করে দিতে পারবেন।”
নাদিয়া ধীরে ধীরে শাড়িটা একটু তুলল। রহিম ক্যামেরা ফোকাস করতে করতে বলল, “আরেকটু… হ্যাঁ… এবার হাতটা হাঁটুর উপর রাখুন… চোখ নিচু করে তাকান…”
নাদিয়ার বুকের ভিতর ধুকপুক করছিল। রহিমের নজর তার পায়ের দিকে, তারপর মুখের দিকে যাচ্ছিল। সে অনুভব করতে পারছিল।
কিছুক্ষণ পর রহিম ক্যামেরা নামিয়ে বলল, “আপা, একটু বিরতি নেওয়া যাক। আপনি ক্লান্ত মনে হচ্ছে।”
তারা বসার ঘরে ফিরে এল। নাদিয়া পানি এনে দিল। রহিম পানি খেয়ে বলল, “আপনার শরীরের অনুপাত খুব ভালো। ক্যামেরায় আরও ভালো ধরা পড়ছে। কবির ভাই ঠিকই বলেছেন।”
নাদিয়া চুপ করে রইল। রহিম আবার বলল, “আপা, যদি আপনি রাজি থাকেন, তাহলে একটু আধুনিক পোশাকেও কয়েকটা শট তুলি। জিন্স আর পাঞ্জাবি যদি থাকে…”
নাদিয়া মাথা নাড়ল। “আছে।”
সে ভিতরে গিয়ে কালো পাঞ্জাবি আর জিন্স পরল। পাঞ্জাবিটা একটু বড় ছিল, কিন্তু জিন্সটা টাইট। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখল। মনে হলো অন্য কোনো মেয়ে হয়ে গেছে সে।
বেরিয়ে এলে রহিমের চোখ আবার থেমে গেল। “আপা… এটা আপনার গায়ে অন্যরকম লাগছে। চলুন উঠোনে।”
এবার শুটটা একটু অন্যরকম হলো। রহিম বলল, “আপা, একটু এগিয়ে আসুন… হাতটা কোমরে রাখুন… এবার পেছন ফিরে তাকান…”
মাঝে মাঝে রহিম এসে পাঞ্জাবির বোতাম একটা খুলে দিল। “এভাবে একটু খোলা থাকলে আলো ভালো পড়বে।”
নাদিয়া কিছু বলল না। রহিমের আঙুল তার বুকের কাছাকাছি এসেছিল। সে শুধু চোখ বন্ধ করে নিল একমুহূর্তের জন্য।
শুট চলাকালীন রহিম হঠাৎ বলল, “আপা, আপনার ছেলে বাড়িতে নেই তো?”
নাদিয়া উত্তর দিল, “কলেজে গেছে।”
রহিম হাসল। “ভালো। একা থাকলে কাজ করতে সুবিধা হয়।”
নাদিয়ার মনে হলো কথাটার ভিতর অন্য কিছু আছে। কিন্তু সে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
বিকেলের দিকে শুট শেষের দিকে এল। রহিম বলল, “আপা, শেষ কয়েকটা শট। আপনি সোফায় শুয়ে পড়ুন। পাঞ্জাবিটা একটু উপরে তুলুন… না না, পেট পর্যন্ত। আলো পড়বে।”
নাদিয়া সোফায় শুলে পড়ল। রহিম এসে তার পাঞ্জাবির নিচের অংশ একটু তুলে দিল। তার আঙুল নাদিয়ার পেটের চামড়ায় লাগল। নাদিয়া কেঁপে উঠল।
রহিম ক্যামেরা তুলে বলল, “এভাবেই থাকুন… চোখ আধবোজা… হ্যাঁ…”
কয়েকটা শট তোলার পর রহিম ক্যামেরা নামিয়ে সোফার পাশে বসল। “আপা, আপনি খুব টেনশন করছেন। শরীর শক্ত হয়ে আছে। একটু স্বাভাবিক হোন।”
সে কথা বলতে বলতে নাদিয়ার হাত ধরল। “দেখুন, হাত ঠান্ডা হয়ে গেছে আপনার।”
নাদিয়া হাত সরাতে গেল, কিন্তু রহিম আলতো করে ধরে রাখল। “আপা, আমি কিছু খারাপ বলছি না। আপনি সুন্দর। ক্যামেরায় আরও সুন্দর লাগছে। কবির ভাই আপনাকে নিয়ে অনেক আশা করছেন।”
নাদিয়া ধীরে করে হাত ছাড়িয়ে নিল। “আর কতক্ষণ?”
রহিম উঠে দাঁড়াল। “আজকের মতো যথেষ্ট। আমি ছবিগুলো এডিট করে কবির ভাইকে পাঠিয়ে দেব। তিনি আপনাকে জানাবেন।”
সে জিনিসপত্র গুছোতে গেল। নাদিয়া উঠে বসল। শরীরটা এখনো গরম লাগছিল। রহিমের ছোঁয়াগুলো মনে পড়ছিল।
রহিম বেরোনোর আগে বলল, “আপা, পরের শুটটা যদি হয়, তাহলে হয়তো একটু অন্যরকম হবে। আপনি চাইলে কবির ভাইকে বলতে পারেন।”
নাদিয়া দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিল। “আচ্ছা।”
রহিম চলে গেল। বাড়িটা আবার চুপচাপ হয়ে গেল। নাদিয়া সোফায় বসে রইল অনেকক্ষণ। তার পেটে রহিমের আঙুলের ছোঁয়া এখনো অনুভব করতে পারছিল।
সন্ধ্যায় নাদিম ফিরে এল। দরজা খুলেই বলল, “মা, কেমন হলো শুট?”
নাদিয়া হেসে বলল, “হয়ে গেছে। রহিম চলে গেছে।”
নাদিম ব্যাগ রেখে মায়ের পাশে বসল। “কী কী পরে শুট করলে? ছবি দেখাবে?”
নাদিয়া মাথা নাড়ল। “এখনো এডিট হয়নি। পরে দেখাব।”
নাদিম মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “মা, তুমি একটু অন্যরকম লাগছো। মুখ লাল।”
নাদিয়া দ্রুত উঠে গেল। “রান্নার কাজ আছে। তুই হাত-মুখ ধুয়ে আয়।”
রাতে খাবার টেবিলে দুজনে বসল। নাদিম কলেজের গল্প বলছিল, নাদিয়া মাঝে মাঝে হ্যাঁ-হুঁ করছিল। মনটা অন্য জায়গায় ছিল। রহিমের কথা, তার ছোঁয়া, কবিরের মেসেজ—সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছিল।
খাবার শেষে নাদিম মায়ের ঘরে এসে বসল। “মা, তুমি যদি র্যাম্পে যাও, আমি তোমার সাথে যাব। একা যেতে দিব না।”
নাদিয়া ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। “তুই আমার ভালো। এখনো কিছু হয়নি। শুধু ট্রায়াল।”
নাদিম মায়ের কাঁধে মাথা রেখে বলল, “মা, তুমি যাই করো, আমাকে বলে করো। লুকাবে না।”
নাদিয়ার বুকটা কেঁপে উঠল। সে ছেলের চুলে আঙুল বুলিয়ে দিল। “লুকাবো না।”
কিন্তু সে জানত, কিছু জিনিস ইতিমধ্যেই লুকিয়ে ফেলেছে।
রাত গভীর হলে নাদিয়া ফোন হাতে নিল। কবির মেসেজ দিয়েছে—
“আপা, রহিম বলল শুট ভালো হয়েছে। ছবিগুলো পেলে আপনাকে পাঠাব। আপনি কেমন বোধ করছেন?”
নাদিয়া উত্তর দিল, “সব ঠিক আছে।”
কবির আবার লিখল, “রহিম বলল আপনি একটু টেনশনে ছিলেন। পরেরবার আরও স্বাভাবিক হবেন। আর আপা… আপনি যদি চান, আমি নিজেই একদিন আসতে পারি আপনার গ্রামে।”
নাদিয়া ফোন রেখে দিল। জানালার বাইরে অন্ধকার। পাশের ঘরে নাদিম ঘুমাচ্ছে। সে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। পাঞ্জাবিটা এখনো গায়ে। জিন্সের বোতাম খোলা।
সে নিজের পেটে হাত বুলাল। রহিমের আঙুলের জায়গাটা। মনে মনে বলল—এটা শুধু শুট। কিছু না।
কিন্তু শরীরটা অন্য কথা বলছিল।