টাকার নেশায় মা – ১ | মা ছেলের সম্পর্ক

নাদিয়ার বয়স ৩৭। স্বামী বিদেশে প্রায় ছয় বছর। ছেলে নাদিমের বয়স ১৮। কলেজের প্রথম বর্ষে পড়ে। বাড়িতে শুধু তারা দুজন।
গ্রামের একপ্রান্তে তাদের বাড়ি। বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ গ্রামের বাড়ি মনে হয়—মাটির উঠোন, তালগাছ, বাঁশঝাড়। কিন্তু ভিতরে ঢুকলে অন্য রকম। সিরামিকের মেঝে, এসি, বড় টিভি, ওয়াইফাই রাউটার। স্বামী বিদেশ থেকে টাকা পাঠায় নিয়মিত। বাড়িটা যেন গ্রামের ভিতরে এক টুকরো শহর।

নাদিয়া আর নাদিম একে অপরের কলিজা। সকালে নাদিম ঘুম থেকে উঠলেই মায়ের গলার আওয়াজ শোনে—চা বানাচ্ছে, রুটি গরম করছে। নাদিম এসে মায়ের পিঠে হাত রাখে, “মা, আজকের চায়ের গন্ধ অন্যরকম।” নাদিয়া হেসে বলে, “তোর জন্য একটু বেশি এলাচ দিয়েছি।”
রাতের বেলায় দুজনেই একসঙ্গে টিভি দেখে। কখনো নাদিম মায়ের পায়ে মাথা রেখে শোয়। নাদিয়া আঙুল বুলিয়ে দেয় ছেলের চুলে। কথা হয় নানা বিষয়ে—কলেজের পড়া, গ্রামের গসিপ, স্বামীর ফোন। স্বামী মাসে একবার ভিডিও কল করে। কল শেষ হলে নাদিয়া চুপচাপ বসে থাকে। নাদিম তখন মায়ের কাঁধে মাথা রাখে, “মা, আমি আছি তো।”

এমনই এক বিকেলে প্রতিবেশী শিরিক এসে বসল। চা খেতে খেতে বলল,
“ভাবি, সারাদিন ঘরে একা একা কী করেন? নাদিম কলেজে চলে গেলে বাড়িটা যেন মরুভূমি হয়ে যায়। অলস সময়টা একটু কাজে লাগান।”
নাদিয়া হেসে বলল, “কী করব বলো? ঘরদোর, রান্নাবান্না ছাড়া আর কী আছে?”
শিরিক বলল, “ইউটিউব চ্যানেল খুলুন। টুকটাক ব্লগ বানান। শাড়ি পরে হাঁটাহাঁটি, বাড়ির আঙিনা, রান্নার ভিডিও—এসব। মানুষ দেখে। একটু একটু করে টাকাও আসতে পারে। আর মনও ভালো থাকে।”
নাদিয়া সেদিন রাতে নাদিমকে সব বলল। দুজনে বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিল। চাঁদের আলো পড়েছে উঠোনে।
“নাদিম, শিরিক কাকা আজ একটা কথা বলল,” নাদিয়া বলল।
নাদিম মায়ের দিকে তাকাল। “কী?”
“ইউটিউব চ্যানেল খোলার কথা। আমি সারাদিন একা থাকি। একটু ব্যস্ত থাকলে মন ভালো থাকবে হয়তো।”
নাদিম চোখ বড় করে বলল, “মা, দারুণ আইডিয়া! তুমি তো কথা বলতে পারো ভালো। আর শাড়ি পরে হাঁটলে তো আরও সুন্দর লাগবে। আমি সাহায্য করব। চ্যানেল খুলে দিচ্ছি এখনই।”

নাদিয়া হাসল। “তুই পারবি?”
“পারব না কেন? আমার ফোনেই খুলে দিচ্ছি।”
সেই রাতেই নাদিম মায়ের ফোনে ইউটিউব চ্যানেল খুলে দিল। নাম রাখল—“নাদিয়ার দিনলিপি”। প্রোফাইল পিকচার তুলল মায়ের—সাদা শাড়ি পরে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে।
পরের দিন সকালে নাদিম কলেজে যাওয়ার আগে মাকে বলল, “মা, আজ বিকেলে আমি ভিডিও তুলব। তুমি প্রস্তুত থেকো।”
বিকেলে নাদিম ফিরে এসেই মাকে নিয়ে উঠোনে গেল। নাদিয়া পরেছিল হালকা নীল শাড়ি। চুল খোলা। নাদিম ফোন হাতে নিয়ে বলল, “মা, একটু হেঁটে দেখাও। ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে কথা বলো। যেন দর্শকদের সাথে কথা বলছো।”
নাদিয়া প্রথমে লজ্জা পেল। “নাদিম, আমি পারব?”
“পারবে মা। আমি আছি তো।”

নাদিয়া হেঁটে হেঁটে কথা বলতে শুরু করল। “আসসালামু আলাইকুম। আমি নাদিয়া। আজকে আমাদের উঠোনের একটু খবর দিচ্ছি…”
নাদিম ভিডিও থামিয়ে বলল, “মা, আরও স্বাভাবিক হও। হাসো। তোমার হাসিটা খুব মিষ্টি।”
দ্বিতীয়বার তুলল। এবার নাদিয়া একটু স্বস্তিতে কথা বলল। ভিডিও শেষে নাদিম এডিট করে আপলোড করে দিল।
কয়েকদিনের মধ্যেই কমেন্ট আসতে শুরু করল। কেউ বলল শাড়ি সুন্দর, কেউ বলল কণ্ঠস্বর শান্ত। নাদিম প্রতিটা কমেন্ট মাকে পড়ে শোনাত। “মা, দেখো কতজন তোমার প্রশংসা করছে।”
নাদিয়া প্রতিবারই হাসত। ছেলের উৎসাহে সে নিয়মিত ভিডিও তুলতে লাগল। কখনো একা, কখনো নাদিম ক্যামেরা ধরে। নাদিম মায়ের জন্য আলাদা একটা ছোট লাইট কিনে আনল। “মা, আলো ভালো হলে ভিডিও সুন্দর লাগে।”

একদিন সন্ধ্যায় নাদিম মাকে নিয়ে বাড়ির পেছনের বাগানে গেল। সেখানে গোলাপগাছ আছে। নাদিয়া লাল শাড়ি পরেছিল। নাদিম বলল, “মা, আজ একটু অন্যরকম করে তুলি। তুমি গাছের পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলো। একটু ঘুরে দাঁড়াও।”
নাদিয়া ঘুরল। শাড়ির আঁচল উড়ে গেল একটু। নাদিম ক্যামেরা নামাতে নামাতে বলল, “মা, তুমি খুব সুন্দর লাগছো আজ।”
নাদিয়া হেসে বলল, “তোর চোখেই শুধু সুন্দর লাগে।”
“না মা, সত্যি। বাবা থাকলেও বলত।”
এমনই চলছিল তাদের দিন। ইউটিউব চ্যানেলটা যেন মা-ছেলের নতুন খেলা হয়ে উঠেছিল।
তবে একটা জিনিস নাদিয়া লুকিয়ে রাখত।
ভিডিওগুলোতে কমেন্টের মধ্যে একজন নিয়মিত কমেন্ট করত—কবির।
প্রথম কমেন্ট ছিল: “আপনার হাঁটার স্টাইল আর শাড়ি পরা দেখে মনে হচ্ছে আপনি মডেল হতে পারেন। খুব সুন্দর লাগছে।”
নাদিয়া প্রথমে সাধারণ ধন্যবাদ দিল। তারপর কবির ইনবক্সে মেসেজ দিল। নাদিয়া প্রথমে উত্তর দেয়নি। কয়েকদিন পর একদিন দুপুরে, নাদিম কলেজে থাকা অবস্থায় সে উত্তর দিল।

কথা শুরু হলো ধীরে ধীরে। কবির জানতে চাইল কোথায় থাকেন, কী করেন। নাদিয়া গ্রামের কথা, স্বামীর কথা, ছেলের কথা—সব বলল। কবির সহানুভূতি দেখাল। “আপা, আপনি একা এত কিছু সামলাচ্ছেন। সাহস আছে আপনার।”
আস্তে আস্তে কথা গভীর হলো। কবির প্রতিদিন সকালে গুড মর্নিং দিত। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে গুড নাইট। নাদিয়াও উত্তর দিত। কিন্তু নাদিমকে কখনো বলেনি। মনে মনে ভাবত—ছেলে জানলে অপ্রয়োজনীয় চিন্তা করবে। এটা তো শুধু কথা।
এক মাস পর কবির একদিন লিখল,
“আপা, ইউটিউব থেকে টাকা আসতে সময় লাগে অনেক। আপনি যদি কোনো এজেন্সির র‍্যাম্প মডেল হতে পারেন, তাহলে নগদ টাকা পাবেন। আপনার লুক তো আছেই। শাড়ি পরে হাঁটার যে স্টাইল, সেটা র‍্যাম্পেও মানাত।”
নাদিয়া উত্তর দিল, “আমি গ্রামের মানুষ। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমার বাড়ি। এখানে এজেন্সি পাবো কোথায়?”
কবির লিখল, “আমি ঢাকায় আছি। এজেন্সির সাথে আমার যোগাযোগ আছে। আপনি চাইলে ব্যবস্থা করতে পারি। প্রথমে একটা ট্রায়াল। কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।”
নাদিয়া সেদিন রাতে অস্থির হয়ে উঠল। নাদিম পাশের ঘরে পড়াশোনা করছিল। নাদিয়া বারবার ফোনের দিকে তাকাচ্ছিল।
পরের দিন সন্ধ্যায় দুজনে বারান্দায় বসল। নাদিম মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “মা, তুমি ক’দিন ধরে চুপচাপ লাগছো। কিছু হয়েছে?”
নাদিয়া একটু ইতস্তত করে বলল, “নাদিম, একটা কথা বলি?”
“বলো মা।”

“আমার ভিডিওতে একজন কমেন্ট করে নিয়মিত। নাম কবির। পরে ইনবক্সে কথা হয়েছে। সে… সে বলছে আমি র‍্যাম্প মডেল হতে পারি। ঢাকায় এজেন্সি আছে তার পরিচিত। ট্রায়াল শুটের কথা বলছে।”
নাদিম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মায়ের হাত ধরে বলল,
“মা, তুমি তো সুন্দর। আমি তো প্রতিদিন দেখি। যদি সুযোগ থাকে, তাহলে করে দেখো না। দুই-একটা র‍্যাম্প সমস্যা কী? তুমি চেষ্টা করে দেখো। আমি আছি তোমার সাথে।”
নাদিয়ার চোখ ছলছল করে উঠল। “তুই রাজি?”
“রাজি না কেন? তুমি খুশি হবে যাতে। আর টাকাও আসবে হয়তো। বাবার ওপর সবসময় নির্ভর করে না থেকে নিজেও কিছু করতে পারবে।”
নাদিয়া ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। “তুই আমার কলিজা রে।”
সেই রাতে নাদিয়া কবিরকে লিখল, “আমার ছেলেও উৎসাহ দিয়েছে। ট্রায়ালের কথা বলো।”
কবির উত্তর দিল, “দারুণ। আমি একজন ফটোগ্রাফার পাঠাব আপনার গ্রামে। নাম রহিম। সে বিশ্বাসযোগ্য। আপনি শুধু প্রস্তুত থাকুন। শাড়ি, লেহেঙ্গা কয়েকটা রাখবেন। আর… একটু আধুনিক পোশাকও যদি থাকে।”

নাদিয়া পড়ে চুপ করে রইল। আধুনিক পোশাক মানে কী, সে বুঝতে পারছিল। কিন্তু ছেলের উৎসাহের কথা মনে পড়ল। নাদিম বলেছে—করে দেখো।
পরের কয়েকদিন নাদিয়া আরও নিয়মিত ভিডিও তুলতে লাগল। নাদিম কখনো কখনো ক্যামেরা ধরত। একদিন নাদিম বলল, “মা, আজ একটু অন্যরকম শাড়ি পরো। ওই মারুন রঙেরটা। আর চুল একটু এলোমেলো রাখো।”
নাদিয়া পরল। নাদিম ভিডিও তুলতে তুলতে বলল, “মা, তুমি ক্যামেরার দিকে এভাবে তাকাও… হ্যাঁ… আর একটু হাঁটো ধীরে।”
ভিডিও শেষে নাদিম এডিট করতে করতে বলল, “মা, এই ভিডিওটা অনেক ভালো হবে। কমেন্ট অনেক আসবে।”
নাদিয়া পাশে বসে ছেলের কাজ দেখছিল। মনে মনে কবিরের কথা ঘুরপাক খাচ্ছিল। ছেলে উৎসাহ দিয়েছে।

Subscribe
Notify of
0 Comments
Newest
Oldest Most Voted